দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

৭০ বছরের দাম্পত্য জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অভাব যেন আরও কঠিন হয়ে ধরা দিয়েছে সাজু শেখ ও তাঁর স্ত্রী নূরজাহান বেগমের জীবনে। ৮৮ বছরের সাজু শেখ নিজেও বার্ধক্যে নুয়ে পড়েছেন। তার ওপর শয্যাশায়ী ৮২ বছরের স্ত্রীকে কোলে নিয়ে ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছেন তিনি। খাবারের জন্য কাঁপা কণ্ঠে আল্লাহর কাছে আকুতি জানাচ্ছেন বৃদ্ধ এই মানুষটি। তার এমন অসহায় দৃশ্য দেখে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখের সামনেই ফুটে উঠেছে এক দম্পতির দীর্ঘ জীবনের কঠিন বাস্তবতা।
ঘটনাটি ৯ সেপ্টেম্বর শেরপুর সদর উপজেলার খুনুয়া চরপাড়া গ্রামের। স্থানীয় এক ব্যক্তি মুঠোফোনে ঘটনার ভিডিও করেন। পরে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নজরে আসে অনেকের। অসহায় দম্পতিকে সহায়তায় এগিয়ে আসেন স্থানীয় মানুষ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
ছোট্ট একটি ঘরে প্রায় ৭০ বছর ধরে সংসার সাজু ও নূরজাহানের। এই দীর্ঘ জীবনে অভাব তাদের নিত্যসঙ্গী। বয়সের ভারে দুজনই এখন ন্যুব্জ। এর মধ্যে প্রায় ছয় বছর ধরে শয্যাশায়ী নূরজাহান। তাকে দেখাশোনা করতে গিয়ে সাজুও অনেকটা ভেঙে পড়েছেন। খাবারের অনিশ্চয়তা আর চিকিৎসার অভাবের মধ্যেও দুজন-দুজনকে আঁকড়ে ধরে আছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই বৃদ্ধ দম্পতির তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে হয়েছে অনেক আগেই। তারা মাঝেমধ্যে মা-বাবার খোঁজ নেন। তিন ছেলের একজন করোনা মহামারির সময় নিখোঁজ হন। আরেক ছেলে ঢাকায় রিকশা চালান। বছরে এক-দুবার বাড়িতে আসেন। শেরপুরে থাকা ছোট ছেলে নূর ইসলাম দিনমজুরি করেন, ঠেলাগাড়িও চালান। কয়েক বছর আগে তার স্ত্রী ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন। তার তিন মেয়ে। নিজের সংসার চালাতেই তাকে হিমশিম খেতে হয়। বৃদ্ধ মা-বাবার দেখভাল করতে পারেন না।
প্রায় ছয় বছর আগে পা পিছলে পড়ে কোমরের হাড় ভেঙে যায় নূরজাহানের। এরপর থেকেই বিছানায় পড়ে আছেন তিনি। অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারেননি সাজু। স্ত্রীকে একা রেখে কোথাও যেতেও চান না। প্রতিদিন সকালে স্ত্রীকে কোলে করে ঘরের বাইরে উঠানে নিয়ে আসেন। কিছুক্ষণ তার পাশে বসে থাকেন। কানে কম শোনেন নূরজাহান। তবু স্ত্রীর ইশারা বোঝার চেষ্টা করেন সাজু, প্রয়োজনীয় কাজগুলোও করে দেন।
একসময় ব্যবসা করতেন সাজু। সেই আয়েই চলত সংসার। এখন বয়সের ভারে কাজ করতে পারেন না। মাঝেমধ্যে কাজের আশায় বাজারে গেলেও দুর্বল শরীর দেখে কেউ কাজ দিতে চান না।
সাজু ও নূরজাহানকে নিয়ে করা ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি জেলা প্রশাসনের নজরে আসে। সোমবার দুপুরে জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমা বিনতে রফিক তাদের বাড়িতে যান। তারা ওই দম্পতির খোঁজখবর নেন। তাদের খাদ্যসামগ্রী, পোশাক, কম্বল ও অর্থসহায়তা দেওয়া হয়। প্রতি মাসে খাবারের জন্য সহযোগিতা দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সামাজিক সংগঠন ‘রক্তসৈনিক বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন’ ওই দম্পতির পাশে দাঁড়িয়েছে।
শেরপুর সদর উপজেলার ইউএনও আসমা বিনতে রফিক জানান, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ৯ সেপ্টেম্বরই ওই পরিবারে খাদ্যসামগ্রী, কাপড় ও অর্থ দেওয়া হয়েছে।
কেএম